জীবন যে একটা সহজ বোধ! সহজ পাঠ! সরল কিছু আত্মতৃপ্তির স্বীকারোক্তিমূলক ব্যক্তিগত অনুভবের সমষ্টি! এই উপলব্ধিটা যে করতে পারেনা, তার মতো অসহায় আর কে হতে পারে?
এই যে পৃথিবীর কাছে আমাদের কত শত চাওয়া! কত পাওয়া না পাওয়ার হিসেব নিকেশ! কত অপ্রাপ্তিকে পেয়ে যাওয়ার লিপ্সা! আকাঙ্খা! আগ্রহ! কত অপ্রত্যাশিত জিনিসের কাছে যেয়ে নতজানু হয়ে বসে থাকা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত! এসবের কোথাও আসলে জীবন নেই!
জীবনকে আমি সবসময় একটা সরলরেখায় দাঁড় করিয়ে রাখি। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া যেসব অস্বাভাবিক ঘটনার সামনে দিয়ে হেটে পাড় হতে হয় গন্তব্যে ফেরার দোদুল্যমান সাঁকো, সেসবকে আমার কাছে জীবনের খুব ঢিলেঢালা খেলার মতো লাগে। এই খেলায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার যে প্রয়াস, যে চেষ্টা, যে ব্যস্ততা, এসব না থাকলে কত'টা মূল্যহীন হয়ে যেত বেঁচে থাকার আয়ুষ্কাল! কত নিভৃতে কাটিয়ে দিতে হতো অবসর! কত'টা সাদাসাধি হয়ে যেত সময়!
জীবনের যে জটিলতা, এটাই তো তার সহজ এবং সরল প্রক্রিয়া! এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে হেটে চলার যে যাত্রা এখানে বিরক্ত হয়ে উঠলেই জীবনে আনন্দের তীব্রতা কমে আসতে শুরু করে। জীবনের সোন্দর্য্য বিলীন হতে থাকে! জীবন তার লাবন্য হারাতে হারাতে অভুক্ত শিশুর মতো নুয়ে পরে! শুকিয়ে যায়! পুষ্টিহীনতায় রোগা হয়ে উঠে! জীবনকে তাই কঠিন ভাবতে শিখিনি কখনো।
মাঝে মাঝে চিন্তার বাইরেও কত কি ঘটে যায়, জীবনে! যে অপ্রাপ্তিতে বিষন্ন হয়ে থাকে বেলা অবেলা, যে না পাওয়াতে বেঁচে থাকার প্রতি ঘৃণা জন্মায়, আফসোস লাগে, হতাশা গ্রাস করে সুন্দর সময়ের ক্যালেন্ডার! সেই না পাওয়া, সেই অপ্রাপ্তি একদিন নিজের অজান্তেই হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিয়ে আঠার মতো লেগে থাকে। এটাই জীবনের চমক। এটাই মানুষের কপালে চকাশ করে দিয়ে যাওয়া জীবনের যাদুর চুমু। যে চুমু চেয়ে চেয়ে হয়না। চেয়ে চেয়ে যে জিনিস পেতে হয়, সে জিনিস পেয়ে গেলে যেই তৃপ্তি, সেটা মূলত কোন তৃপ্তিই না। জীবনের কাছে চাওয়া বন্ধ করে দিয়ে, জীবনের কাছ থেকে যে প্রাকৃতিক প্রাপ্তি, জীবনের যে যাদুর চুমু, স্পর্শ, জীবনের যেই অকৃত্তিম ভালোবাসা না চাইতেই পাওয়া যায়, তার তৃপ্তিতে যে ঢেকুর উঠে সেসবের ঘ্রাণটাই আলাদা রকমের হয়।
আমি জীবনের কাছে কিচ্ছু চাইতে পারিনা কখনো। এটা আমার ব্যর্থতা নাকি সফলতা সেসব নিয়ে ভেবেও সময় নষ্ট করার মতো সময়কে অযথা মিছেমিছি একটা ভুল চিন্তায় নিমগ্ন করার আগ্রহটা বরাবরই আমার কম। আমি জীবনকে ছুটে যেতে দিই। হাটতে দিই। নিজের ইচ্ছেতে এ গলি সে গলি ঘুরে বেরাতে দিই। জীবনকে আমি তো আমার নিয়ন্ত্রনে আনতে পারবোনা কখনো। যদি নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়েও আসি কখনো, সে জীবনকে আমার জীবন মনে হয়না। যে জীবন নিয়মের, সেই জীবনের রন্ধ্রেঃ রন্ধ্রেঃ কৃত্তিমতা। কৃত্তিমতার জীবন মানুষের নিজের সৃষ্টি। এই রুটিন মাফিক জীবনে সফলতা আসলেও, সেই জীবনকে খোলা মনে উপলব্ধি করা যায়না। যে জীবনকে হিসেব নিকেশ করে উপলব্ধি করতে হয়, আমার মতো সহজ সরল ভাবে জীবন কাটাতে চাওয়ার বাসনা বুকে পুশে রাখা মানুষরা সে জীবনের কাছ থেকে পালিয়ে বেরায় সর্বদাই।
আমার যে কখনো জীবনের প্রতি অনিহা আসেনা, সেরকমটা নয়। মাঝে মাঝে প্রচন্ড ভেঙ্গে পরি। কখনো কখনো টুকরো হয়ে যাই। তবে, জীবনের প্রতি আমার অভিযোগ হয়না।
জীবনকে উপলব্ধি করার যে বোধ আমি অর্জন করেছি, সেই বোধকে পুঁজি করে অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকি সুন্দর সময়ের স্বর্গরাজ্যের দিকে। জীবন আমাকে কখনো বঞ্চিত করেনি। যদিও কখনো কখনো ঢের সময় নিয়েছে দুর্বিষঃহ অভিশপ্ত সময়কে অতিক্রম করিয়ে দিতে, তবুও কখনো খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়নি। জীবনের এই মঞ্চে ক্লান্ত হতে হতে আবিষ্কার করেছি, জীবন একদিন তার যাদুর উপহার নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় সম্মুক্ষে। এটাই জীবনের ম্যাজিক৷ এটাই জীবনের প্রক্রিয়া! এটাই জীবনের সরলতা।
জীবন যখন একবার তার সমস্তটা নিয়ে সামনে এসে উপস্থিত হয়! যখন না চাইতেই চমকে দেয়! যখন অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি এসে হাতের মুঠোয় ধরা দেয়! সেই প্রাপ্তির আনন্দে শরীরের সমস্ত নিথর হয়ে যাওয়া কোষ পুনরায় জাগ্রত হয়ে উঠে।
এই আনন্দটা অনেকটা প্রথমবার প্রেমে পরার মতন। যখন সবকিছুকে সুন্দর মনে হয়। শরীরের লোমে লোমে, কোষে কোষে আনন্দ ছড়িয়ে পরে। মস্তিষ্কে, রক্ত কণিকায়, শিরা, উপশিরায় যখন টুং টাং মিউজিকের শব্দ বেজে উঠে! নতুন করে মানুষ আবার বাঁচতে শুরু করে!
জীবন মাঝে মাঝে প্রথম প্রেমের মতন সুন্দর চমক নিয়ে সামনে হাজির হয়ে বুঝিয়ে দেয়, অসময় ফুরালেই সুসময় এসে টুপ করে বসে পরে বুক পকেটে।
এত'টা অল্প সময়ের এই জীবনকে জটিল বানিয়ে ফেললে, জন্মকে বৃথা মনে হয়। একটাই তো জীবন। এই জীবনের পরে তো আরো অনেক জীবন নেই। এই অল্প কয়েকটা মাস, কয়েকটা বছর কাটিয়ে দেওয়ার জন্য যে ব্যস্ততা, সেই ব্যস্ততায় ভুলতে বসে যেতে হয়, কত কি করা বাকি! কত কি দেখা হয়নি! কত কিছুর নিগূঢ় রহস্য জানা হয়নি এখনো!
শুধু অপ্রাপ্তি নিয়ে হা-হুতাশ করতে করতে যে জীবনের ঘড়ির কাটা ঘুরে চলেছে অবিরাম, সেই জীবন নিয়ে কি ই বা করা যায়। অপ্রাপ্তিতে দমে যেতে নেই। না পাওয়া এই অপ্রাপ্তির তালিকা জীবনের অলংকার। খুব বেশি প্রাপ্তিতেও মানুষ সুখী হয়না। অনেক বেশি প্রাপ্তি মানুষকে যেমন দাম্ভিক করে তোলে, তেমনি করে তোলে অসহায়।
প্রাপ্তির ভার সহ্য করার ক্ষমতাই বা মানুষের কতটুকু?
জীবনকে তার নিজস্ব নিয়মে চলতে দিতে হয়। আটকে রাখতে চাইলে, বেঁধে রাখতে চাইলে, লাগাম পরাতে চাইলে, জীবন তার নিজস্ব লাবন্যতা হারিয়ে ফেলে। যে জীবন মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রনে চলে সে জীবনে মানুষের কখনো পূর্ণজন্ম হয়না। যে জীবনকে চাইলেই লাগাম টেনে ধরা যায়, সেই কৃত্তিম জীবনের স্বাদ গ্রহন করে কখনো তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যায়না।
জীবন একটা চলমান প্রক্রিয়া, এটাকে মুক্ত করে দিতে হয়। স্বাধীন করে দিতে হয়। জীবনকে যখন মানুষ মুক্ত করে দিতে পারে, জীবন তখন সে মানুষকে মুক্তির স্বাদ আরোহন করাতে পায়ের কাছে এসে কুর্ণিশ করে মাথা নুইয়ে বসে থাকে।
জীবনকে আমি পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছে, তাই জীবন আমাকে সময়ে অসময়ে, কারনে অকারনে বিস্ময়ের সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়।
এই যে বারবার বিস্মিত হওয়ার এই বোধ, লাগাম পরিয়ে রাখা রুটিনের নিয়মমাফিক ছুটে চলা জীবনের কাছ থেকে কখনো পাওয়া যায়না।
জীবনকে নিজের নিয়ন্ত্রনে না রেখে বরং তার হাতে বেঁধে রাখা দাসত্বের বন্ধনটা খুলে দিলেই, জীবন সহজ সরল প্রাঞ্জল হয়ে উঠে। মানুষের কাছে যে জীবনের কোন দাসত্ব নেই, সে জীবন মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে উঠে।
যে জীবনের কাছে কিছুই চায়না, জীবন তাকে সবটাই দিয়ে দেয়। এটাই জীবনের রহস্য। এটাই জীবনের পূর্ণাঙ্গ সত্য!
যেভাবে যাচ্ছে দিন, যাচ্ছেই তো! জীবনের কাছে আমার চাইবার কিছু নেই! পাওয়ারও কিছু নেই! জীবন আমার কাছে কেবল একটা বোধ! একটা অকৃত্তিমতা! সহজ সরল ভাবে ছুটে চলা একটা সমান্তরাল রেখার মতন!
এই নিষ্পাপ জীবনের প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। আমি বরং বারবার বিস্মিত হই জীবনের নানান রংয়ে! ঢংয়ে! সৌন্দর্যে এবং ছুটে চলার ক্লান্তিহীন গতিশীল যাত্রার দৃশ্যপটে!

Comments

Popular posts from this blog