সেদিন একজন মেসেজ দিয়েছেন, "ভাইয়া, আমি একটা সমস্যায় আছি! আমাকে কি একটু সাজেশন দিবেন?"
এরকম প্রশ্ন আমি প্রায়ই শুনি! এই প্রশ্ন গুলোতে আমি বিব্রত হই!
যেমন বিব্রত হই, কেউ একটা চাকরি ঠিক করে দিতে বললে!
বিব্রত হই এই কারনে যে, কিছু কিছু ব্যপার মানুষের নিয়ন্ত্রনে থাকেনা!
এসব ব্যপারে প্রশ্নকর্তা এবং জব সিকার কারোই হয়তো কোন উপায় জানা থাকেনা!
তারা আমাকে বিশ্বাস করে বলে! তারা একটা আস্থার জায়গা থেকে হয়তো চাকরিটা জরুরী বলে বার্তা পাঠায়!
আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, ইশ সব মানুষকে যদি আমি একটা করে চাকরি দিতে পারতাম!
তারা একটা সাজেশন চাওয়ার আগে হয়তো অনেক ভেবেচিন্তে আমাকে সিলেক্ট করে! তারা বিশ্বাস করে, আমি তাদের সমস্যাটা হয়তো অনুভব করতে পারবো!
কিন্তু শেষ পর্যন্ত না দিতে পারি একটা পার্ফেক্ট সলিউশন, না দিতে পারি একটা চাকরি!
সলিউশনটা আমি ইচ্ছে করেই দিই না! দেই না এই কারনে যে, আমি আসলে তার সমস্যাটা, দুঃখ-কষ্টটা তার মতো করে অনুভব করতে পারবো না!
আমি হয়তো একটা অনুমান নির্ভর সমাধান দিতে পারি। তবে সমস্যা এটাই যে, সে যেহেতু আমাকে বিশ্বাস করে তার সমস্যার কথাটা বলেছে, সেহেতু সে আমার সমাধানটাকেও পার্ফেক্ট হিসেবে বিবেচনা করে নিতে পারে!
আমার ব্যক্তিগত জীবনে আমি কারো কাছে কখনো কোন সমস্যার সমাধান চাইনা!
আমি এটা পছন্দও করিনা! আমি মাঝে মাঝে নিশ্চিত থাকি, আমি যে সিদ্ধান্তটা নিচ্ছি, এটা ভালো কিছু নাও রিটার্ন দিতে পারে!
তবুও, সিদ্ধান্তটা তো আমার নিজের!
ছোট্ট একটা জীবন নিয়ে পৃথিবীতে এসে যদি পরনির্ভরশীল হয়ে বাঁচতে হয়, তাহলে আমার জন্মটা আসলে একটা ব্যর্থ জন্ম!
অনুভূতি বলতে আমি বুঝি সুখ এবং দুঃখকে! আমি যেই সঠিক অথবা ভুল সিদ্ধান্তই নিই না কেন, সুখ অথবা দুঃখের ভেতর থেকে যেকোন একটা আমি রিটার্ন পাবো!
সুখ এবং দুঃখের মাঝামাঝিতে আমার আর কোন অনুভূতি নেই! আমার জীবনে কখনো কোন কনফিউশনাল ফিলিংস আসেনি!
আমি দুঃখ এবং সুখ দুটোকেই মেনে নিতে পারার ক্ষমতা সৃষ্টি করে নিয়েছি!
আমার জীবনে যত'টা সমস্যাই আসুক না কেন, আমি কখনোই বিচলিত হয়ে যাই না।
বহু দুঃখ কষ্টকে পেছনে ফেলে এই শক্তি আমাকে অর্জন করতে হয়েছে!
সবকিছু মেনে নেওয়ার ক্ষমতাটা এমনি এমনি হয়না! জীবনে বারবার ঠেকে গিয়ে, ঠকে গিয়ে মানুষ মানসিক শক্তি অর্জন করতে শেখে!
আমি যদি আমার একটা সমস্যার কথা কাউকে বলি, সে বড়জোর একটা অনুমান নির্ভর সমাধান দিতে পারবে!
নিজের শরীরের ভেতরে বড় হওয়া ক্যান্সারের গল্পটা অন্যের মুখে কষ্ট পাওয়ার ছাপ ফুটিয়ে তুলতে পারে! গল্পের শ্রোতাকে বুঝাতে পারেনা, কত'টা যন্ত্রণা শরীরে বয়ে বেড়াতে হয়!
তোমার অসুস্থতায়, তোমাকে আমি বড়জোর বলতে পারি, "একটু বিশ্রামে থেকো!" এর বেশি কিছু না!
তোমার সমস্যায় আমি হয়তো এক লাইনের একটা সমাধান দিয়ে বলে দিতে পারি, "নিজের জন্য বাঁচতে শেখো!"
নিজের জন্য সবাই বাঁচে!
আমাকে কেউ এই বাঁচতে শেখানোর সাজেশন না দিলেও আমি বুঝতে পারি, আমার নিজের জন্য বাঁচা উচিত!
তবুও, কিছু কিছু দুঃখ কষ্টের আয়তন সৌরজগতের চেয়ে বড় হয়ে যায়!
কিছু কিছু সমস্যায়, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা মরে যায়! ওসব এক লাইনের সমাধান তোমাকে, বাঁচতে শেখাতে পারবেনা!
আমি বাঁচতে না চাওয়ার ইচ্ছে থেকে বাঁচতে শিখেছি!
নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ কখনো অন্যের হাতে ছাড়তে হয়না!
দুখঃ কষ্ট সমস্যা মানুষের ব্যক্তিগত জিনিস! নিজের সমস্যার সমাধানটা নিজেকেই করতে হয়!
আমি চাইনা, জীবনের শেষ মুহূর্তে যেয়ে আমি কখনো বলি, আমাকে অন্য কেউ বাঁচতে শিখিয়েছে!
আমি বেঁচে থাকি, নিজের প্রয়োজনে!
মানুষের জীবনের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা অপ্রাপ্তিকে নিজের কাছেই রাখতে হয়!
নিজের নগ্ন শরীরের মতো নিজের সমস্যাকে নিজের কাছে আগলে রাখতে হয়!
তোমার নগ্ন শরীরটা যেমন যেকেউ চাইলেই ছুতে পারেনা, তোমার দুঃখ কষ্টও যে কাউকে ছুতে দিও না! অন্য কেউ তোমার ব্যক্তিগত অনুভূতিতে হাত বুলাবে, এটা তোমার ব্যর্থতা!
আমার যখন সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়েছিলো! আমি প্রচন্ড একাকিত্ব বোধ করতাম!
কেউ কেউ এসে হয়তো বলতো, আরে মানুষের চলে যাওয়াতে নিজেকে থামিয়ে দিও না।
আমি নিজেকে তখন চাইলেও আর চালাতে পারিনি! একাকিত্বের সাথে থাকতে থাকতে আমি এই একাকিত্বটাকে অনুভব করতে শিখে গিয়েছিলাম! একসাথে আকাশ দেখার আনন্দের চেয়ে একা একা আকাশ দেখার দুঃখটা মানুষকে বেশি স্পর্শ করে!
জীবনের এই ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতিটাই আসলে বেঁচে থাকাকে সুন্দর করে!
আমাদের সমস্যা আসলে আমাদের একার! এর ভাগ কোথাও ছড়িয়ে দিতে নেই!
আমার খারাপ সময়ে আমি কাউকে কাছে পাইনি বলেই আমি আমার নিজের পাশে দাঁড়াতে শিখেছি!
নিজের সাথে নিজের কাঁধের স্পর্শটা আমাকে একা হতে দেয়না!
আমার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যায় আমি আমার নিজের সাথে কথা বলি!
নিজেই নিজেকে হ্যা এবং না এর যুক্তির সামনে দাঁড় করিয়ে দেই!
আমি আমার নিজের জন্য কখনোই ভুল সিদ্ধান্তটা নিতে পারবো না!
মানুষ মানুষকে হারালে কষ্ট পায় তখন, যখন সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে!
অন্য একটা মানুষের চলে যাওয়াতে আমার কষ্ট হওয়া মানে, আমি তার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিলাম! অন্যকে হারিয়ে কষ্ট হয়, অথচ নিজেকে হারিয়ে ফেলার জন্য নিজের প্রতি নিজের মায়া হয়না?
কিছু মানুষ কখনো বড় হয়না!
বড় হতে হলে, নিজেকে অনুভব করতে শিখতে হয়! নিজেকে অনুভব করার জন্য দুঃখ কষ্ট আর সমস্যার সামনে দাঁড়ানো বাধ্যতামূলক!
এমনি এমনি তো বড় হওয়া যায়না! জীবনে আলাদা আলাদা রূপকে সহ্য করতে করতে মানুষ একদিন বড় হয়ে যায়!
আমার কাছে মাঝে মাঝে যারা সমস্যার সমাধান চায়, আমার নিজেকে অপরাধী লাগে এটা ভেবে যে, ওটা আসলে আমার জীবন না!
ওটা আমার জীবন হলে, আমি সামলে নিতে পারতাম! অথচ, আমার দু একটা জ্ঞান মূলক কথায় সে এটা সামলে নিতে পারবেনা!
আমি বেশিরভাগ সময় মানুষকে তার সমস্যার কোন সমাধান দেই না এই কারনে যে, সে বুঝতে শিখুক, পৃথিবীটা অন্য কারো জন্য না!
ব্যক্তিগত জীবনের সমাধানটা কেউ কাউকে করে দিতে পারেনা!
নিজের সমস্যার সমাধানটা নিজেকেই করতে হয়!
নিজের সমস্যাকে নিজের ভেতর লালন না করতে পারলে, মানুষ কখনো বড় হতে পারেনা!
এতে আমি হয়তো মানুষটার কাছে একজন খারাপ মানুষ হয়ে যাই, তবে সে আসলে একা একা বাঁচতে শিখে যায়!
তার সমস্যার সমাধান আসলে এটাই যে, নিজের উপর ডিপেন্ডেন্ট হও!
তোমার দুঃখ কষ্টকে স্পর্শ করার ক্ষমতা আর কারো নেই!
প্রতি বেলায় নিয়ম করে যে মানুষ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়, তার চলে যাওয়ার পর তুমি নিজের খাবারের কথাটা নিজেই নিজেকে মনে করিয়ে দিবে! প্রয়োজনকে কখনো অবহেলা করা যায়না, কারো জন্যই না!
কারো যত্নে বেঁচে থাকা আনন্দের, কারো অযত্নে বেঁচে থাকা অসম্ভব নয়!
যত্ন পাওয়াটাই বরং বোনাস!
দিনশেষে,
প্রতিটা মানুষকেই তার নিজের পাশে দাঁড়াতে হয়! কারো অবহেলার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতা থাকে নিজেকে নিজে অবহেলা করার মধ্যে!
আমি সবসময় তুমুল আনন্দে বাঁচি!
যখন প্রচন্ড মন খারাপ হয়, তখনও আমি আনন্দ পাই! মন খারাপ হলে আমার একাকিত্ব বোধ হয়! একা হলে, নিজেকে খুঁজে পাই!
কখনো কখনো একা একা ঘরে বসে থাকি! অবসরে টুকটাক লিখালিখি করি!
ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই!
এসব মূলত আমার নিজের জন্যই! কখনো কখনো লেখা কারো কাছে ভালো লাগে, কখনো ভালো লাগেনা!
ওসবে আমি পাত্তা দিই না! আমি তো লিখি নিজের জন্য! লিখতে গেলে, জীবনকে কি গভীর ভাবে অনুভব করা যায়!
আমি খাই, ঘুমাই, কষ্ট পাই, হাসি, কান্না করি; আমার নিজের জন্য!
কারো চলে যাওয়াতে আমার মন খারাপ হয়, "সে ভালো থাকবেনা" এটা ভেবে না! আমার মন খারাপ হয়, আমি হয়তো ভালো থাকবো না!
তাকে আমি প্রচন্ড ভালোবাসি মানে আসলে আমি আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসি!
তাকে ভালোবাসতে আমার নিজের ভালো লাগে বলে ভালোবাসি!
মানুষ তো তার নিজের চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবাসতে পারেনা!
কারো জীবনের সমস্যার সমাধান আমি দিতে পারিনা! আমি আমার জীবনের সমস্যাকে মোকাবেলা করতে ব্যস্ত থাকি!
আমি কেবল আমাকে অনুভব করতে পারি! অন্য কাউকে অনুভব করতে পারি বললে, মিথ্যে বলা হবে! বড়জোর অন্য কাউকে কিছুটা হয়তো অনুমান করতে পারি।
অনুমান করে আমি কারো জীবনের সিদ্ধান্ত দিতে পারিনা!
যার যার সমস্যা, তার তার!
নিজেকে টিকিয়ে রাখার এই যুদ্ধে, নিজেকেই যোদ্ধা হতে হয়!
তোমার বুকের উপরের বেয়নেটের খোঁচার আঘাতটা বাইরের দর্শকরা তোমার মতো করে অনুভব করতে পারবেনা!
তোমার ক্ষত স্থানের ব্যথাটা তোমার একার! তুমি ছাড়া তোমার মতো করে তোমাকে আর কেউ বুঝবেনা! কখনোই না!

Comments

Popular posts from this blog