বছর দশেক আগের কথা; তখন সবে মাত্র টিউশনি শুরু করেছি। একটা বাসায় বছরখানেক লজিং মাস্টার হিসেবে ছিলাম। যে বাসায় থাকতাম, সেখানে থাকা খাওয়া ছিল ফ্রী। ফ্রী মানে বিনিময়ে তাদের বাচ্চাকে প্রতিদিন দু ঘন্টা করে পড়াতে হতো।
ঢাকায় আসার পর বাসা থেকে টাকা নিয়ে চলেছি অল্প কিছু দিন। পরিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা তখন খুবই খারাপ।
বাসায় টাকা চাইতে নিজের কাছে নিজেরই কেমন বিব্রত লাগতো। তাছাড়া, চাইলেই যে হুট করে টাকা দিয়ে দিবে, অত'টা স্বচ্ছলতা আমাদের ছিলনা। তখন বিকাশ টিকাশ এসব আসেনি বাজারে। পোষ্ট অফিস থেকে টাকা তুলতে হতো। খুব প্রয়োজন না হলে বাসায় টাকার কথাও কখনো বলতাম না।
ছেলের টাকা দরকার হলে, মা বাবা যেভাবেই হোক টাকা হয়তো পাঠাবে। অথচ, আমি তো জানতাম টাকাটা ম্যানেজ করা তাদের জন্য কত'টা কষ্টকর হয়।
লজিং থাকার পাশাপাশি ক্লাস টুয়ের একটা বাচ্চাকেও পড়াতাম। মাসে ১০০০ টাকা দিত! ওই ১০০০ টাকা হাত খরচ হিসেবে রাখতাম।
সমস্যাটা হতো তখন, যখন পরনের জামাটা পুরাতন হয়ে যেত। নতুন একটা টি-শার্ট কেনার বাজেট মেলাতে পারতাম না।
রোজ রোজ একই টি-শার্ট পরে টিউশনি যেতাম। মনের মধ্যে সবসময় একটা আতংক থাকতো, না জানি কেউ এখনই জিজ্ঞেস করে "আচ্ছা স্যার, আপনার কি এই একটাই জামা?"
যদিও কখনো কেউ এই প্রশ্ন করেনি, তবুও ভয়টা ছিল।
আমি যখন টিউশনিতে যেতাম, প্রথম প্রথম স্টুডেন্টের বাসায় নাস্তা দিত।
নাস্তাটা টেবিলে আসার সাথে সাথে আমি লজ্জিত হতাম। আমি কেন জানি কখনোই প্রাপ্যের চেয়ে এক্সট্রা বেনিফিটটা নিতে পারিনা।
সপ্তাহখানেক পর স্টুডেন্টকে বললাম "শোন, তোমার আম্মুকে বলবা, আমাকে যাতে আর কখনো নাস্তা না দেয়! এটা আমার পছন্দ না!"
এটা বলার পরের দিন যেয়ে দেখি, খাবারের গুনগত মান একটু বেড়েছে। স্টুডেন্টের মা হয়তো ভেবেছিলো, সামান্য বিস্কুট টিস্কুট দেয় বলেই হয়তো, আমি নাস্তা দিতে নিষেধ করেছি।
আমি গুনগত মান সম্পন্ন খাবার না খেয়েই সেদিন চলে আসলাম। আমি পড়াই, বিনিময়ে মাস শেষে টাকা নিই। আমি চাইনা, রোজ রোজ আমার নাস্তার জন্য কেউ অযথা ঝামেলায় পরুক।
আমি যখন ছোট, তখন আমাদের বাসায় হুট করে কোন মেহমান চলে আসলে, মায়ের মুখটা শুকনো দেখা যেত। হাতে টাকা নেই, মেহমানকে দেওয়ার মতো খাবার নেই।
কি রেখে যে কি করবে, মা বুঝে উঠতে পারতো না। তখন কচমচ বিস্কুট নামে একটা বিস্কুট ছিল। খুব সম্ভবত সেসময় ওটার দাম ৮ থেকে ১০ টাকা ছিল। আমি দৌড়ে এলাকার দোকান থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট বাকিতে এনে দিতাম। আমি জানি, মেহমানকে ঠিক মতো আপ্যায়ন করতে না পারাতে কষ্ট থাকে। এই দৃষ্টিকোন থেকে, স্টুডেন্টের বাসায় বলেছিলাম, যাতে নাস্তা না দেয়।
মানুষের ঝামেলার কারন হতে ইচ্ছে হয়না কখনো।
একসময় লজিং থাকা বন্ধ করে দিলাম। এলাকায় বিভিন্ন দেয়ালে " বাসায় যেয়ে পড়াইতে চাই" শিরোনামে বিজ্ঞপ্তি লাগালাম।
কোন ফোন আসেনা। চাচাতো বোনকে ধরে পুরান ঢাকায় দুটো টিউশনি নিলাম। ৩ হাজার করে টাকা দিত।
মাসে ২৬ দিন ধানমন্ডি থেকে পুরাতন ঢাকার নবাবপুর যেয়ে পড়াতে হয়। জ্যাম ঠেলে যেতে দু ঘন্টা আর আসতে দু ঘন্টা।
শরীর ক্লান্ত হয়ে আসে। তবুও বেঁচে থাকার এই যুদ্ধে নিজেকে টিকিয়ে রাখাটাই জরুরী হয়ে উঠেছিলো।
প্রেমিকাকে সেদিন বললাম- শোন, আমাদের ফ্যামিলি কিন্তু খুব একটা নামীদামি ব্রান্ডের ফ্যামিলি না। আমরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ!
কখনো খাবার পেলে খাই, না পেলে পেটে পাথর বেঁধে থাকি।
আমার সাথে থাকতে হলে, সাধারন লাইফ লিড করতে হবে। এই যে এখন না চাইতেই সব পেয়ে যাও, আমার সাথে থাকলে এমন নাও হতে পারে।
সে বললো- আমি থাকলেই হবে। আর কিছু লাগবেনা।
তাকে বললাম- মাটির চুলায় রাঁধতে পারো? নলকূপ চেপে পানি তুলতে পারো? দু এক বেলা না খেয়ে থাকার অভ্যাস আছে?
সে বললো- প্রয়োজন হলে পারবো।
যদিও আমাদের ফ্যামিলির অবস্থা এখন অত'টা খারাপ নেই। মাকে গ্যাসের চুলা এনে দিয়েছি, যাতে মাটির চুলায় রান্না করতে না হয়। পানি তোলার মটর কিনে দিয়েছি। বয়সটা হয়েছে তো, নলকূপ আর চাপতে পারেনা।
একটু ঝড় হলেই টিন দিয়ে ঘেরাও করা বাথরুম ভেঙে যায় বলে, মাকে ইট পাথরের বাথরুম বানিয়ে দিয়েছি। একটা ঘরে মেহমান আসলে ঘুমানোর জায়গা হয়না বলে, আরেকটা ঘর তুলে দিয়েছি। অন্যের ফ্রীজে মাছ মাংশ রাখতে হয় বলে, ফ্রীজ কিনেছি। পাটা পুতো দিয়ে মশলা পিষতে কষ্ট হয় বলে, ব্যালেন্ডার দিয়ে এসেছি। মায়ের নামে ডিপোজিট করেছি, যাতে তার মনে হয়না কখনো সে এখনো অর্থনৈতিক সমস্যায় আছে।
বাবা কষ্ট করে আমাদের তিন ভাইবোনের পড়ার খরচ চালাতো। যখন থেকে উপার্জন করি, তখন থেকে ছোট বোনের পড়ার খরচ দিয়েছি।
আমরা তিন ভাইবোন দু বছর করে ছোট বড়। যখন ছোট বোনের ভার্সিটির খরচ চালাতে হতো, তখন আমি নিজেও ভার্সিটিতে পড়ি। দুজনের খরচ এবং সংসার সামলাতে সামলাতে কখন যেন বড় হয়ে গেছি।
আমার প্রেমিকাকে বলেছি- জীবন সব সময় আমাদের এম্বিশনের মতো হয়না। আমার সাথে থাকতে হলে, সাধারন হতে হবে।
দু টাকার বাদাম আর ১০ টাকার পানি পুড়ির প্রেম হলেও যে ভালোবাসা টিকে থাকে, এটা বুঝতে শিখতে হবে।
আমার প্রেমিকা বলে- আমি সব পারবো। আমার চাহিদা কম। তুমি আমাকে যেভাবে রাখবা, সেভাবে থাকবো। কখনো কিছু চাইবোনা।
আমার মায়া বেড়ে যায়। তবুও আমি জানি, যেভাবে রাখবো, সেভাবে মানুষ সবসময় থাকতে পারেনা।
তবুও আমি বারবার মনে করিয়ে দিই, আমি ছোট ঘরের ছেলে। চাইতেই সব পেয়ে যাইনি। না পেতে না পেতে একদিন বড় হয়ে গেছি।
বুঝে গেছি, জীবন কঠিন! তারপর একদিন জীবন সহজ হয়ে যায়! পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে, যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়।
আমার প্রেমিকার এবং আমাদের প্রেমের বয়স কম। সে এখনো আমাকে নিয়ে ফ্যান্টাসীতে আছে। এটা একসময় থাকবেনা। ফ্যাটাসী তো কাটে কখনো না কখনো।
এজন্য দুদিন পর পর বলি- মাটির চুলায় রাঁধতে পারবা? ১০০০ টাকার টিউশনিতে সংসার চলবে? কখনো যদি না খেয়ে থাকতে হয়, ছেড়ে যাবা?
সে হাসে আর বলে- ভালোবাসি তো! আমি আছি! কোথাও যাবো না! কাছে আসো, চোখে চুমু দিয়ে দিই!
_______________________________
ব্যক্তিগত গল্প : দারিদ্রতা এবং প্রেম!

Comments

Popular posts from this blog