রেল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। হাজার হাজার মানুষ ট্রেনের অপেক্ষায়। রেলস্টেশনে দাঁড়ালে নানান রকম মানুষ দেখা যায়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিন্মবিত্ত সব ধরনের মানুষই এই স্টেশনে ভিড় জমায়। একেকজনের গন্তব্য একেক জায়গায়।
ট্রেন আসলো বিকেল ৫ টায়। আমার উদ্দেশ্য ময়মনসিংহ যাবো। সেখানকার তেমন কিছুই চিনি না। এইবারই প্রথম যাচ্ছি।
যদিও প্রকৃত ঠিকানা হাতে থাকলে, পৃথিবীর যেকোন জায়গায় সহজেই পৌছে যাওয়া যায়।
ট্রেনে উঠে বসলাম। আমার পাশের সিটে একজন রূপবতী মেয়ে বসে আছেন। তার কানে হেডফোন, হাতে মোবাইল, একটা হাল্কা মেরুন রংয়ের জামা পরা।
জীবনে অনেক মানুষের মুখে পাশের সিটে সুন্দরী মেয়ে বসার গল্প শুনেছি। আমার জীবনে এটাই প্রথম। তবে, এই মেয়েকে সুন্দরী বললে অন্যায় হবে, তাকে রূপবতী বলা যায়।
রূপবতী এবং সুন্দরীদের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। সব রূপবতীই সুন্দরী, তবে সব সুন্দরীই রূপবতী না। রূপবতী মেয়েদের দিকে তাকালে, তাকে চেনা চেনা লাগে। মনে হয়, এই মেয়েকে কোথায় যেন দেখেছি। কোথাও হয়তো তার সাথে দেখা হয়নি, তবুও ভীষন কাছের মানুষ মনে হয়।
কাছের মানুষ লাগার কারনটা হলো, পুরুষের মস্তিষ্কে একটা কল্পনার মেয়ে থাকে। তাদের জীবনে যে মেয়েকে রূপবতী লাগে, সে মেয়েটা দেখতে অনেকটা কল্পনায় বেড়ে উঠা কোন মায়াবতীর মত দেখতে।
ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে। বাহিরে সন্ধ্যা নেমে গেছে। আকাশে পূর্নিমা চাঁদ। তবুও সেই চাঁদের আলো হার মেনে যাচ্ছে পাশের সিটের রূপবতী মেয়ের কাছে।
মেয়েটাকে চাঁদের মতো সুন্দর বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না, চাঁদটা এই মেয়ের মতো সুন্দর!
ট্রেন চলছে। জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকছে বগিতে। সে বাতাসে উড়ে চলেছে এক রূপবতী মেয়ের চুল। মানুষ এত অসহ্য রকমের সুন্দর হয় কি করে!
ঘন্টাখানেক দুজন চুপচাপ বসে আছি। আমার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। কখনো অপরিচিত কোন মেয়ের সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস না থাকায়, পেরে উঠছিনা।
বেশ কিছুক্ষন পর পাশ থেকে একটা মেয়ে কন্ঠ কথা বলে উঠলো " একটু পানি হবে আপনার কাছে?"
আমার ব্যাগে কোন পানি নেই, তবুও আমি ব্যগের চেইন খুলে পানির বোতল খুঁজতে লাগলাম।
যেমন স্কুলে বাড়ির কাজের খাতা না নেওয়ার পরও, স্যার খাতা বের করতে বললে ব্যগের ভেতর খাতা খুঁজতে শুরু করতাম, তেমন করে পানির বোতল খুঁজতে লাগলাম।
এক মিনিট পর সে আবার বললো- পানি নেই, নাহ?
আমি বললাম- খুঁজে পাচ্ছিনা।
সে বললো- ঠিক আছে।
কিছুক্ষন পর আমি ট্রেনের ক্যান্টিন থেকে এক বোতল পানি এনে তার দিকে ধরে বললাম- এই যে পানি!
সে বললো - আমার নাম রূপরেখা।
আমি বললাম- রূপবতী হওয়া উচিত ছিল।
সে আমার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো- মানে?
আমি জবাব দিলাম- কিছুনা।
কথা বলতে বলতে পরিচয় পর্বটা শেষ হলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
- কোথায় যাবেন?
- ময়মনসিংহ। আপনি?
- আমিও।
- বাসা ওখানেই?
- নাহ, একটা কাজে যাচ্ছি।
- ওহ।
- আপনার বাসা ওখানেই?
- হ্যা। চাকরির জন্য ঢাকাতেই থাকি। মাসে একবার বাড়ি যাই।
- ঢাকায় কোথায় থাকেন?
- উত্তরাতে। আপনি?
- আমি মগবাজারে থাকি।
- তাহলে তো একই শহরে থাকি।
- এর আগে তো কখনো দেখা হয়নি।
- মানে, বুঝিনি।
- মানে এরকম একটা রূপবতী মেয়েকে একই শহরে থেকেও দেখা হয়নি, এটা দূর্ভাগ্য।
- ফ্লার্টিং করার চেষ্টা করছেন?
- করতে চাচ্ছি, সাহস হচ্ছে না।
- এত সাহস না থাকাই ভালো।
- আপনার দিকে তাকাতেই ভয় লাগছে।
- আমি কি দেখতে বাঘ বা সিংহের মতো?
- তা না। বেশি রূপবতী মেয়েদের দিকে তাকানো যায়না। বুক ধরফর করে। জ্বীভের সামনে এসে সব কথা আটকে যায়। তাছাড়া রূপবতীদের সাথে খুব মেপে মেপে কথা বলতে হয়।
- মেপে কথা বলতে হয় কেন?
- রূপের একটা দাম্ভিকতা আছে।
- ওটা বোধয় সুন্দরীদের ক্ষেত্রে। রূপবতীরা কোমল হয়।
- আপনি নিজেকে রূপবতী ভাবছেন?
- খুউব!
- নিজের কাছে নিজেকে রূপবতী লাগে?
- যার নিজের কাছে নিজেকে রূপবতী লাগেনা, সে আসলে রূপবতীই না।
- এত'টা নিশ্চিত কি করে হলেন?
- আপনি রূপবতী বলেছেন একটু আগে, তাতেই নিশ্চিত হলাম।
- আপনি আসলেও রূপবতী।
- আমি জানি।
- কি করে জানেন?
- আপনি এক ঘন্টা আমাকে দেখে রূপবতী বলেছেন। আমি তো রোজ রোজ নিজেকে আয়নায় দেখি। আমার চেয়ে বেশি তো আমাকে আর কেউ দেখেনি।
- একটা অপরিচিত মানুষের সাথে এভাবে কথা বলছেন, ভয় লাগেনা?
- নাহ। ভয় কেন লাগবে? ভয়ংকর মানুষের মুখের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। আপনাকে সহজ সরল লাগছে। তাছাড়া এত সময়ের রাস্তা একা একা যেতেও বোর লাগে।তারচেয়ে আপনার সাথে গল্প করতে করতে যাই।
- আমিও ভেবেছিলাম, একা একা বোর লাগবে। যাইহোক, আপনার সাথে দেখা হয়ে যাওয়াতে জার্নিটা বোরিং লাগছেনা।
- বিয়ে করেছেন?
- নাহ।
- প্রেমিকা নেই?
- উহু।
- এই যুগে একটা প্রেমিকাও যোগাতে পারেননি?
- ইচ্ছে হয়নি।
- আগে কারো সাথে সম্পর্ক ছিল?
- হ্যা।
- ছেড়ে গেছে?
- বিয়ে হয়ে গেছে।
- আপনার সাথে হলো না কেন?
- সেসব তো অনেক গল্প।
- আমাদের তো আর কোন কাজ নেই। শুনি আপনার গল্প।
- আমাদের গল্পটা শুরু হয়েছিলো আরো ১২ বছর আগে। আমি তখন সবে মাত্র ইন্টারমেডিয়েট কম্পিলিট করেছি।
তার নাম লতা। আমি আদর করে ডাকতাম চারুলতা। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং থেকে পরিচয়। সেখান থেকেই বন্ধুত্ব তারপর প্রেম। যদিও প্রথম প্রথম পটানোর চেষ্টা করার সময় বুঝিনি কখনো ভালোবেসে ফেলবো, তবুও প্রথম স্পর্শেই প্রেম হয়ে গিয়েছিলো। কেমন যেন একটা স্পর্শ। হাত ধরার সাথে সাথে হৃদপিন্ড ধুকপুক করে উঠে। অনেকটা ইলেকট্রিক শকড এর মতন।
এরপর ফোনে কথা হতে হতে, প্রেম জমে পায়েস হয়ে গেলো। প্রথম প্রথম রাজী ছিল না, এরপর রাজী হয়েছে। মেয়ে মানুষ পটে যাওয়ার পরও চায়, তাকে আরেকটু পটানো হোক।
রাজী হওয়ার পরও তারা বিপরীত মানুষটাকে ঝুলিয়ে রাখতে পছন্দ করে।
এই মেয়েটা অসম্ভব রকমের সুন্দর। গাল গুলো নতুন আলুর মতন। গায়ের রং ফর্সা। শুধু ঘুম থেকে উঠার পর তার গায়ের রং হলদে ফর্সা লাগে। চোখের নিচে লালচে দাগ। দেখেই বুঝা যায়, ঠিক মতো ঘুমায় না মেয়েটা।
কথা বলে বুঝতে পারলাম, সে অনেকটা ব্রয়লার মুরগির মতো। নরম, সাদাসিধে, পবিত্র।
সম্পর্কটা হওয়ার ৭ দিন পর তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো। আমি আটকাতে পারলাম না। আটকানোর চেষ্টাও করিনি। চেষ্টা করতে হলেও কিছু জিনিস খুব লাগে।
আমি তো তখন মাত্র কলেজ শেষ করেছি। টাকা পয়শা উপার্জন করা শিখিনি। একটা দুটা টিউশনি করে নিজে চলি। একা চলাটাই কঠিন হয়ে যায়। সেখানে দুজন মানুষ চলাটা সহজ না।
তাছাড়া, পরিবারের প্রতি থাকা দায়িত্ববোধটাকেও অবহেলা করতে পারিনি। মধ্যবিত্ত ঘরে জন্মালে, মা বাবার স্বপ্ন থাকে অনেক। হুট করে কাউকে নিয়ে ঘরে চলে যাওয়াটা আমাদের মতো পরিবারে শোভা পায়না। তাছাড়া চারুলতা নিজেও মা বাবার মতের বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো মেয়ে না। নিজে কষ্ট পেয়ে মরে যাবে, তবুও বুঝতে দিবেনা।
লতা প্রচন্ড চাপা স্বভাবের। লতার বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পরও আমরা আসলে কেউই কাউকে ছাড়া থাকতে পারতাম না। দুদিন পর পর সিদ্ধান্ত নিতাম আলাদা হওয়ার। আবার দুদিন পর পর একসাথে হয়ে যেতাম।
একজন অন্যজনের কন্ঠস্বর না শুনলে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে যেতাম। হাত না ধরতে পারলে, বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন বেপোরোয়া হয়ে যেতো।
যার সাথে লতার বিয়ে হয়, সে কানাডাতে থাকে। বিয়ে না, এংগেইজমেন্ট হয়েছিলো। বাঙালী মেয়েদের আংটি পরানোর পরই তারা নিজের মস্তিষ্কে একটা সংসার সাজিয়ে ফেলে।
যদিও লতার ভেতর আমার জন্য প্রেম ছিল, তবুও একটা সম্পর্কের মায়া জন্মেছিলো তার স্বামীর জন্য। আমি খুব করে টের পেতাম, তার ভেতরে একটা পরিবর্তন আসছে।
আমাদের সম্পর্কটা এমন অবস্থায় চলেছিলো ৩ বছর। একদিন রাতে লতার সাথে আমার ফোনে কথা হচ্ছিলো। হঠাত সে বললো, আরেকটা কল এসেছে। আমি তোমাকে পরে ফোন দিচ্ছি। লতা ফোন কেটে দিলো।
আমি অনেকসময় অপেক্ষা করলাম। লতা আর কল দেয়নি। কিছুক্ষন পর আমি নিজেই কল করলাম, লতা ফোন ধরে জন্মের কান্না কাঁদছে। ভেতর থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না পাচ্ছে তার।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে লতা?
সে জবাব দিল- ও খুব অসুস্থ, এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে।
আমি বললাম- ও কে?
লতা বললো- আবীর।
আমি তাকে মন খারাপ করতে নিষেধ করলাম। বললাম, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি কান্না করো না। ফোন রেখে নিজেরই ভীষন কান্না পাচ্ছে। লতার কান্নার ভেতর একটা সুপ্ত প্রেম আছে। লতার সচেতন মন আমাকে ভালোবাসে, অবচেতন মন ভালোবাসে আবীরকে।
এইখান থেকেই আমি দূরত্ব বাড়িয়েছি। কাছের মানুষের সাথে দূরত্ব বাড়ানোর মতন কঠিন কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই।
যোগাযোগটা ছিল। একদিন হুট করে লতার সাথে আমার যোগাযোগটা বন্ধ হয়ে যায়। লতার ফোন বন্ধ হয়ে যায়। যেখানে ছিল, সে বাড়িতে যেয়ে দেখি, ১ তারিখে বাসা ছেড়ে দিছে। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ এটাই শুধু জানি। আর কিছু জানতাম না। সকাল বিকাল যত্ন নেওয়া মানুষ হুট করে হারালে, সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। আমার দিন আর কাটে না। আমি খেতে পারিনা। ঘুমাতে পারিনা। আমার হাত ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়। মাঝরাতে বুকের ভেতর শূন্যতা অনুভব হয়।
আমার লতার কন্ঠস্বর শুনার আকুলতায় দমবন্ধ হয়ে আসে। আমি আর লতাকে খুঁজে পাইনি কোথাও। এরপর অনেক অনেক দিন আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি।
মরে যাবো ভেবেছিলাম, অথচ এখনো বেঁচে আছি। বেঁচে থাকার প্রয়োজনকে অবহেলা করা যায়না। আমি এখন দিব্যি বেঁচে আছি। এই তো অনেকদিন পর আপনার মতো কোন রূপবতীকে ভালো লেগে গেলো। তারমানে, লতার স্মৃতিও আজকাল আবছা হয়ে গেছে।
রূপরেখা মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনছে। তার চোখ দুটো টলমল করছে। যেন চোখের পলক ফেললেই টুপ করে জল পরে যাবে।
রূপরেখা আমার দিকে তাকিয়ে বললো - আমি কি আপনাকে একটু স্পর্শ করতে পারি?
স্পর্শ করার আগেই ট্রেন পৌছে গেছে স্টেশনে। হুইসেল বেজে চলেছে। রূপরেখাকে নেমে যেতে হবে। নেমে যেতে হবে আমাকেও। রূপরেখাকে নিতে তার বোন এসেছে।
রূপরেখা, আমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে গেলো।
আমিও তার সাথে তার বোনের সামনে যেয়ে দাঁড়ালাম। রূপরেখা পরিচয় করিয়ে দিলো, এটা আমার লতাপু।
পরিচয় পর্ব শেষে রূপরেখা চলে যাচ্ছে, তার সাথে হেটে যাচ্ছে চারুলতা!
আমি দাঁড়িয়ে আছি একা প্ল্যাটফর্মে।
জীবনের এই স্টেশনে এভাবেই মানুষের পর মানুষ আসে , এভাবেই একের পর এক মানুষ চলে যায়। কারো চলে যাওয়া আটকানোর ক্ষমতা কারো নেই।
কারো জন্য কেউ থেমে থাকেনা। দিনশেষে সবাইকেই তার ব্যক্তিগত ঘরে ফিরে যেতে হয় , ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়।

Comments

Popular posts from this blog