- আচ্ছা অনিন্দ্য, আমাকে কি কখনো তোমার বিরক্ত লাগে?
- এরকম কেন বলছো?
- নাহ, এমনিই! এত বছর একসাথে আছো, একই ঘরে বাস করছো, একটা মানুষকেই দিনের পর দিন দেখে যাচ্ছো, বিরক্ত লাগেনা?
- নাহ! এসব তো এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে! তোমাকে আর নতুন করে পড়তে হয়না; মুখস্থ করে ফেলছি। তোমার রাগ, অভিমান, যত্নে একসময় যে মুগ্ধতা ছিল, সেসব মুগ্ধতা এখন নিত্য দিনের প্রয়োজনীয় জিনিসের মতো হয়ে গেছে!
রোজ রোজ একই জিনিস পেলে, সে জিনিস স্বাভাবিক হয়ে যায়!
- ভালোবাসাও কমে যায়? ভালো লাগা হ্রাস পায়?
- অনেক বছর একসাথে থাকলে, এটা আর টের পাওয়া যায়না! ভালোবাসাটা অভ্যাস হয়ে যায়! ভালো লাগাটা অনুভব করা যায় না!
এই যে বছরের পর বছর নিজেকে আয়নায় দেখতে দেখতে ভালোবেসে ফেলি, এটা টের পাওয়ার সময় হয়না!
তোমাকে তো আয়নার মানুষ লাগে! রোজ রোজ দেখি! নিজের প্রতিচ্ছবির মতো!
নিজেকে কতটুকু ভালোবাসি, এটা যেমন অনুভব করার চেষ্টা করিনা, তোমাকেও কতটুকু ভালো লাগে এটা অনুভব করতে পারিনা!
আমি আর তুমি দুজন আলাদা মানুষ হলেও আমরা মূলত একজন!
- এই অভ্যাসে মুগ্ধতা নেই!
- এই অভ্যাসটাই মুগ্ধতার সন্তান! একটা সময় ছিল, আমরা একসাথে আকাশ দেখতে দেখতে সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছি!
এখন তো বয়সটা বেড়েছে! বয়স বেড়ে গেলে, একসাথে জোসনা দেখা হয়না! কখনো দেখা হলেও, আয়োজন করে জোসনা দেখতে হয়! আমরা অনেকদিন একসাথে জোসনা দেখি না, এই ব্যপারটাকে মাথায় নিয়ে জোসনা দেখার পরিকল্পনা করতে হয়!
- আমার বেশ মনে পড়ে, এক সময় তুমি অফিস শেষে ঘরে ফিরে আমার আঙুল ধরে বসে থাকতে! এত'টা শক্ত করে ধরে রাখতে যে, মাঝে মাঝে এমন মনে হতো, আঙুল ছাড়লেই বোধয় আমি পালিয়ে যাবো! এই স্পর্শটা কতদিন পাইনা!
- আঙুল ছুয়ে থাকতে থাকতে এটা তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে!
প্রথম প্রথম আচমকা আমার হাতটা তোমার শরীরে লেগে গেলেই তুমি কেপে উঠতে!
এখন আর কেপে উঠো না! স্পর্শরাও একদিন পরিচিত হয়ে যায়!
আঙুল ছুয়ে দেখায় যে অনুভূতি, সেই অনুভূতিকে অনুভব করতে হলে এখন আমাদের দূরত্ব প্রয়োজন!
- দূরত্ব কেন?
- কাছে থাকলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যায়!
- আচ্ছা, মাঝে মাঝে কি এমন হয়না, আমাকে দেখতে দেখতে তোমার অসহ্য লাগে!
- নিজেকে কখনো অসহ্য লাগে?
- নাহ!
- তোমাকে আমি আমাকে ভাবি!
- সন্তানের বাবা হওয়ার আগে তুমি আমাকে যেমন ভালোবাসতে, সন্তানের বাবা হওয়ার পর যত্ন কমিয়ে দিয়েছিলে!
- শোন নিতিকা, ভালোবাসা ব্যপারটা আসলে সসীম! প্রতিটা মানুষের জীবনে ভালোবাসা ধারন করার একটা লিমিটেশন থাকে!
একসময় শুধু তুমি ছিলে, সম্পূর্ন ভালোবাসাটা পেয়েছো! তারপর যখন সন্তান জন্ম নিলো, ভালোবাসা ভাগ হয়ে যেতে শুরু করলো! একজনকে ভালোবাসতে হলে, আরেকজনের প্রতি ভালোবাসাটা কমাতে হয়! এটাকে বলা হয়, কনজাম্পশন অব লাভ!
একটা জিনিস খেয়াল করে দ্যাখো, একটা মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসার পর নতুন করে কাউকে ভালোবাসতে যায়, সে পারেনা!
নতুন মানুষের প্রতি ভালোবাসা যতটা বাড়তে থাকে, পুরাতনের প্রতি ভালোবাসা ততোটাই কমতে থাকে! ভালোবাসার এক্সচেঞ্জটা আসলে ব্যস্তানুপাতিক!
- তুমি কি এসব অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে অবাক হচ্ছো অথবা বিরক্ত?
- নাহ, এসব প্রশ্ন তোমার ভেতর একদিনে জমেনি। অনেক দিন, অনেক বছরের জমানো অভিযোগ তুমি ভালোবাসা দিয়ে ঝেড়ে ফেলতে চাইছো!
অভিযোগ আর অভিমানদের বুকে জমিয়ে রাখতে নেই!
- আচ্ছা, সংসারটা তোমার কখনো একঘেয়ামী লাগেনি?
- নাহ, লাগেনি! সংসারহীন জীবনই বরং একঘেয়ামী হয়!
চালটা কিনে আনলে ডালটা ফুরিয়ে যাওয়ার এই ব্যস্ততাই তো জীবন!
- সংসার পুরাতন হলে কি মায়া কমে যায়?
- মায়া বেড়ে যায়! তবে, এই বেড়ে যাওয়াটা বুঝা যায়না!
মায়া স্থায়ী হয়ে গেলে, ওটা ভালোবাসা হয়ে যায়! তুমি এটাকে অভ্যাস বলতে পারো, আর এই অভ্যাসটাই আসলে প্রেম!
- আমাকে কখনো অবিশ্বাস করো?
- হ্যা করি!
- কখন?
- যখন মন ভাল না থাকলেও বলো, ঠিক আছি!
- তুমি এটা বুঝতে পারো?
- হ্যা, খুব বুঝতে পারি! তখন তোমার কন্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে যায়!
- আজ রাতে একসাথে আকাশ দেখি?
- রোজ রোজ তো তুমি একাই দ্যাখো! কখনো ডেকেছো?
- তুমি খেয়াল করো?
- তুমি বিছানা থেকে উঠে গেলে আমার ঘুম ভেঙে যায়! তোমার ঘ্রাণটাও তো আমার মুখস্থ!
নিকিতা অনিন্দ্যের হাতের আঙুল ধরে বসে আছে! এই স্পর্শটা নিকিতার পরিচিত।
এই স্পর্শে মায়া আছে! ভালোবাসা আছে! মুগ্ধতা আছে!
এই মানুষটার ঘ্রানটা নিকিতা চেনে! এটা তার পুরাতন মানুষ! যে মানুষকে সে একসময় প্রচন্ড অনুভব করতে পারতো!
সংসার করতে করতে নিকিতা খেয়াল করেনি, ভালোবাসা মুখস্থ হয়ে গেলে, অনুভব স্বাভাবিক হয়ে যায়!
মানুষটা সেই আগের মতোই থাকে, অভ্যাসটা সবকিছু স্বাদহীন করে দেয়!
অথচ, কাছের মানুষ মূলত অভ্যাসই হয়! অভ্যাস হতে পারেনা, দূরের মানুষ!
অনিন্দ্য জানে, নিকিতার বুকে জমে থাকা অভিযোগটাই তার ভালোবাসা!
যাকে মানুষ ভালোবাসেনা, তার প্রতি কখনো অভিযোগ জন্মায় না!
মানুষ আসলে কাছের মানুষকে আরো বেশি কাছে পাওয়ার আকুলতা নিয়ে বেঁচে থাকে!
অথচ, কাছে থাকা কাছের মানুষ যত কাছেই আসুক না কেন, তাকে কাছে আসা মনে হয়না!
মানুষ কাছে থাকলে, তার নৈকট্য টের পাওয়া যায়না! নৈকট্য টের পাওয়া যায়, কাছের মানুষ দূরে গেলে।
সংসার একটা একঘেয়ামীর ব্যপার! একজন অন্যজনকে সারাজীবন পাশের বালিশে দেখতে দেখতে যে একঘেয়ামীটা বোধ করে, এটাই অভ্যাস!
পৃথিবীর সমস্ত অভ্যাসই আসলে ভালোবাসা!
অনিন্দ্য ঘুমাচ্ছে; নিকিতা পাশে বসে অনিন্দ্যের দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে!
বাহিরে চাঁদের আলো! তারা দুজন একসাথে আজও জোসনা দেখছেনা!
তবে, নিকিতা জোসনার আলোতে অনিন্দ্যকে দেখছে আর ভাবছে,
মানুষটার মুখে এত অসহ্য রকমের মায়া কেন?

Comments

Popular posts from this blog